বাংলাদেশের কৃষি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে। আমন মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই দরজায় কড়া নাড়ছে রবি ও বোরো মৌসুম। দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বোরো ধানের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে এই মৌসুমে সার, সেচ, বীজ কিংবা জ্বালানির সামান্য সংকটও শেষ পর্যন্ত শুধু কৃষকের সমস্যা হয়ে থাকে না—তার প্রভাব পড়ে দেশের খাদ্যবাজার, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
তাই বোরো মৌসুম শুরুর আগে সার নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
গুদামের মজুত বনাম মাঠের বাস্তবতা
সরকারি হিসাবে আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার মজুত ও নতুন আমদানির উদ্যোগ রয়েছে। এটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু কৃষকের মূল প্রশ্ন অন্য জায়গায়—সার গুদামে আছে, কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে কৃষকের হাতে পৌঁছাবে তো?
দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের সার না পাওয়া, দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করা এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কেনার অভিযোগ বারবার সামনে আসে। এখানেই আমাদের উদ্বেগ।
সারের নিরাপত্তা শুধু কত লাখ টন সার আমদানি হলো—এই হিসাব দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হলো, একজন কৃষক যখন জমিতে সার প্রয়োগ করবেন ঠিক সেই সময়ে তিনি প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার সঠিক জায়গায় এবং সরকার-নির্ধারিত দামে পাচ্ছেন কি না।
বোরো মৌসুমে ভুল করার সুযোগ খুব কম। কয়েক সপ্তাহের সরবরাহ বিঘ্নও কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা, ফলন এবং শেষ পর্যন্ত দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
জরুরি পাঁচটি নীতিগত অগ্রাধিকার
আমাদের মতে, এখন পাঁচটি জায়গায় বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, জেলাভিত্তিক চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কোন জেলায় কত টন ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি বরাদ্দ হয়েছে, কতটা গুদামে আছে এবং কতটা ডিলারের কাছে পৌঁছেছে—এই তথ্য জনসমক্ষে থাকলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা কঠিন হবে।
দ্বিতীয়ত, ডিলার পর্যায়ে কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন। পর্যাপ্ত জাতীয় মজুত থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো এলাকায় কৃষক নির্ধারিত মূল্যে সার না পান, তাহলে সমস্যাটি কোথায় হচ্ছে তা দ্রুত শনাক্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত, আমদানি অনুমোদন আর বাস্তবে সার দেশে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক বাজার, পরিবহন ব্যবস্থা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাই অনুমোদিত আমদানিকে দ্রুত বাস্তব চালানে পরিণত করা জরুরি।
চতুর্থত, দেশীয় সার উৎপাদনকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেই বাংলাদেশের কৃষক অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন—এটি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য টেকসই ব্যবস্থা নয়।
কৃষক অনুদান নয়, উৎপাদন উপকরণ চান
সবশেষে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কৃষককে শুধু উপকারভোগী হিসেবে নয়, খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
একজন কৃষক সার চাইছেন মানে তিনি কোনো অনুদান চাইছেন না। তিনি দেশের মানুষের খাবার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি উৎপাদন উপকরণ চাইছেন। সেই সার যদি সময়মতো না পৌঁছায়, কয়েক সপ্তাহ পরে সেটি দিলেও অনেক ক্ষেত্রে তার পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
এ কারণেই আমাদের আহ্বান—সংকট হওয়ার পরে অভিযান নয়, সংকট হওয়ার আগেই প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হোক।
সরকারের হাতে মজুতের হিসাব আছে, আমদানির সুযোগ আছে, প্রশাসনিক কাঠামোও আছে। এখন প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছ বণ্টন, নিয়মিত তদারকি এবং কৃষকের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা।
বোরো মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই যদি এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সম্ভাব্য সার সংকট অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
আমরা চাই না আরেকবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হোক যেখানে সরকারি হিসাবে গুদাম ভর্তি সার থাকবে, অথচ কৃষক মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে বলবেন—“সার পাচ্ছি না।”
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে গুদামের হিসাব আর কৃষকের বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান আছে, সেটি এখনই দূর করতে হবে।
মোঃ হুমায়ুন কবির
ম্যানেজিং এডিটর
KrishiBartha.com